বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০১:৫৮ এ.এম
২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৭ জিলহজ্জ ১৪৪৭ হিজরি
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিঃ সারাদেশব্যাপী কালের যাত্রা পত্রিকায় প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহীরা অভিজ্ঞতা ও জীবনবৃত্তান্ত অফিসিয়াল ঠিকানায় ইমেইল করুন।
সেলিম জাহান বাংলাদেশের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য: সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও কিছু কথা। abc
  • মতামত
  • abc editor - ১৬ আগস্ট, ০৩:২৬ পি.এম ১৪৭

গত বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশ জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক’ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত ও উপস্থাপিত হয়েছে। উপর্যুক্ত বিষয়ের ওপর এটিই প্রথম দেশজভাবে সম্পন্ন করা প্রতিবেদন। মোটাদাগে প্রতিবেদনটির তিনটি উপসংহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক, বাংলাদেশের প্রতি চারজন মানুষের একজন এখনো বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্য স্থিত। দুই, এ দেশে আয়-দারিদ্র্যের চেয়ে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার বেশি। তিন, আমাদের দেশে বহুমাত্রিক বঞ্চনার ক্ষেত্রে গোষ্ঠীগত ও আঞ্চলিক ব্যবধান রয়েছে।

প্রথাগতভাবে দারিদ্র্যের আলোচনায় আয়-দারিদ্র্য বিষয়টিই প্রাধান্য পায় বিশ্লেষণাত্মক দিক থেকে এবং পরিমাপেও। কিন্তু এ কথা আজ সর্বজনস্বীকৃত যে দারিদ্র্য বিষয়টি একরৈখিক কিংবা একমাত্রিক নয়। আয়বহির্ভূত বিষয়গুলোতেও বঞ্চনা থাকতে পারে; যেমন শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, পুষ্টিতে, সুপেয় পানির ক্ষেত্রে কিংবা কর্মনিয়োজনে। আয়ের ঘাটতি সব সময় এসব বঞ্চনাকে প্রতিফলিত করে না। যেমন একজন ব্যক্তি অত্যন্ত ধনশালী হতে পারেন, কিন্তু তিনি যদি অশিক্ষিত হন, তাহলে আয়-দারিদ্র্যে তিনি দরিদ্র নন, কিন্তু শিক্ষা মাত্রিকতায় তিনি বঞ্চনার শিকার। কিন্তু কোন মাত্রিকতায় বঞ্চনা সবচেয়ে তীব্র বা চরম, তা বস্তুনিষ্ঠ অনপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা যায় না, বিষয়টি আপেক্ষিক এবং সেই সঙ্গে মানসজাত। একেক মানুষের কাছে একেক ধরনের বঞ্চনা অগ্রাধিকার পায়।

সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে মানব উন্নয়ন শুধু মানুষের বস্তুগত কুশলের ওপর নির্ভর করে না, সেই সঙ্গে তার কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা, তার অংশগ্রহণের অধিকার, মানুষ-পরিবেশ ভারসাম্য ইত্যাদির ওপরও নির্ভর করে। বস্তুগত কুশল অর্জন করার পরও একজন মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না-ও থাকতে পারে। অথবা একজন ব্যক্তিগত কুশল অর্জনকারী মানুষকে যদি শুধু তার গাত্রবর্ণের কারণে বিভিন্ন সামাজিক স্থানে প্রবেশাধিকার দেওয়া না হয়, কিংবা সামাজিক নানান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করতে দেওয়া হয়, তাহলে সেসব ঘাটতিও মানুষকে বঞ্চিত করে। সুতরাং চূড়ান্ত বিচারে মানব-দারিদ্র্য একমাত্রিক নয়, বহুমাত্রিক।

বহুমাত্রিক এই দারিদ্র্যের পরিমাপের জন্য ২০১০ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং অক্সফোর্ড দারিদ্র্য ও মানব উন্নয়ন কেন্দ্রের যৌথ প্রচেষ্টায় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য একটি বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক গঠন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানুষের জীবনযাত্রা মানের ১১টি মাত্রিকতা নিয়ে (যেমন, পুষ্টি, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) এই সমন্বিত সূচকটি গড়ে উঠেছে। এ সূচকটি সম্পর্কে পাঁচটি পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য।

প্রথমত, এ সূচকটি দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য একরৈখিক কোনো পরিমাপ নয়। এটি বঞ্চনার অন্য দিকগুলোও ধর্তব্যের মধ্যে আনে এবং তাই এটি বহুমাত্রিক। দ্বিতীয়ত, যেহেতু বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে আয় অন্তর্ভুক্ত নয়, সুতরাং এটি মূলত আয়বহির্ভূত দারিদ্র্যের ওপরই নজর দেয়। তাই আয়-দারিদ্র্যের আপাতন বুঝতে হলে আলাদা করে আয়-দারিদ্র্যের পরিমাপের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে হবে। তৃতীয়ত, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকও শুধু মানুষের বস্তুগত কুশলকেই আমলে আনে, কিন্তু মানুষের কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা, তার অংশগ্রহণের অধিকার, মানুষ-পরিবেশ ভারসাম্যের ব্যাপারটি সে সূচকের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং এটি বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সীমাবদ্ধতা। চতুর্থত, দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক সর্বাঙ্গীণ সঠিক একটি পরিমাপ, এমনটা ভাবার অবকাশ নেই। এই পরিমাপের ত্রুটিগুলো বিভিন্ন গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পঞ্চমত, এই সূচকের পরিমার্জনা ও পরিশীলনের জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।

অক্সফোর্ড দারিদ্র্য ও মানব উন্নয়ন কেন্দ্র প্রায় প্রতিবছরই বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ১০০টির বেশি দেশের জন্য এ সূচকটি তৈরি করা হয়। এই সূচকের পরিমাপের ফলাফল বাৎসরিক বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়। এ বছরের বৈশ্বিক প্রতিবেদনটি কয়েক মাস আগে প্রকাশিত হয়েছে। এর বিষয়বস্তু ছিল সংঘাত ও বহুমাত্রিক দারিদ্র্য। উপর্যুক্ত প্রতিবেদন ফলাফলে বলা হয়েছে যে বিশ্বের ৬৩০ কোটির মধ্যে ১১০ কোটি মানুষ (১৭ শতাংশ) বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। এই ১১০ কোটি বহুমাত্রিক দরিদ্র মানুষের ৯৬ কোটি মানুষই (৮৪ শতাংশই) আবার গ্রামে বাস করে। অন্যদিকে বহুমাত্রিক দরিদ্রদের মধ্যে অর্ধেকই শিশু-কিশোর অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় ৫৪ কোটি শিশু-কিশোর বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। সুতরাং বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের একটি তাৎপর্যপূর্ণ গ্রামীণ ও তারুণ্য মাত্রিকতা আছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন পরিকল্পনা কমিশনের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকের ফলাফলের দিক তাকাই, তখন দেখি যে ২০১৯ সালে এ দেশে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের আপাতন ছিল ২৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি চারজন লোকের মধ্যে একজন বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। অনপেক্ষ সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের চার কোটি লোক ২০১৯ সালে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেছিল। সামগ্রিক এ সংখ্যার পটভূমিতে পাঁচটি পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ:

এক, দেশে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের অনপেক্ষ আপাতন কমেছে; ২০১৩ সালে সাড়ে ৬ কোটি লোক থেকে ২০১৯ সালের ৪ কোটি লোক। দুই, বাংলাদেশে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার (২৪ শতাংশ) আয়-দারিদ্র্যের হারের (১৯ শতাংশ) চেয়ে বেশি। সুতরাং আয়ের ঘাটতি দিয়ে এ দেশের মানুষের সব বঞ্চনাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তিন, গ্রামবাংলায় বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের আপাতন (২৭ শতাংশ) শহুরে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের (১৩ শতাংশ) দ্বিগুণের বেশি। চার, অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ২৯ শতাংশ, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই হার ২১ শতাংশ। পাঁচ, বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের আপাতন সবচেয়ে বেশি সিলেট বিভাগে (৩৮ শতাংশ)। ছয়, বাংলাদেশের বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার (২৪ শতাংশ) বৈশ্বিক হার (১৭ শতাংশ) ও দক্ষিণ এশিয়ার হারের (২১ শতাংশের) চেয়ে বেশি।

বাংলাদেশে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে যেসব বঞ্চনা এই দারিদ্র্যকে ঘনীভূত করেছে, তার শীর্ষে রয়েছে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি। তারপর শিক্ষার সময়কাল, আবাসন, পয়ঃনিষ্কাশন, পুষ্টি ইত্যাদি। দেশের ২১ শতাংশ মানুষের আবাসন নিতান্ত নিচু মানের। দেশের প্রতি পাঁচজন মানুষের একজন আবাসন, আন্তর্যোগ ও পয়ঃনিষ্কাশনের দিক থেকে বঞ্চনার শিকার।

এখন সংগত প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য কমানোর জন্য করণীয় কী? প্রথমত, শুধু আয়-দারিদ্র্য হ্রাস করা থেকে নীতিমালার লক্ষ্য আয়বহির্ভূত বিষয়গুলোর ওপর নিবদ্ধ করতে হবে। সুতরাং কৌশলের দিক থেকে শুদ্ধ প্রবৃদ্ধিচালিত নীতিমালার পরিবর্তে সামাজিক সেবাবৃদ্ধির কৌশলের ওপর মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, আবাসন, পুষ্টি, শিক্ষা ইত্যাদি যে মাত্রিকতাগুলো বহুমাত্রিক দারিদ্র্যকে ঘনীভূত করে, নীতি-কৌশল ও সম্পদ সেখানে কেন্দ্রীভূত করা দরকার। বাংলাদেশে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য হ্রাস করতে হলে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মানের ওপর জোর দিতে হবে। তৃতীয়ত, জনগোষ্ঠীর দিক থেকে ও অঞ্চলের দিক থেকে যেসব গোষ্ঠী বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার (যেমন অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের জনগোষ্ঠী) এবং যেসব অঞ্চলে এই দারিদ্র্য ব্যাপক ও গভীর (যেমন সিলেট বিভাগ) এর ওপর বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। পিছিয়ে পড়া জেলাকে (যেমন বান্দরবান) নীতিমালা ও সম্পদ বণ্টনে অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থত, বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের নানান মাত্রিকতার ওপর উপাত্ত সংগ্রহকে জোরদার করা প্রয়োজন। আরও বেশি ও বিশ্বাসযোগ্য উপাত্ত যদি লভ্য হয়, তাহলে তা নীতিমালা প্রণয়ন এবং পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে সহায়ক হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের ব্যাপ্তি ও প্রকৃতি বোঝার জন্য এবং লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থার কার্যকারিতার জন্য সঠিক উপাত্তের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পঞ্চমত, একটি যথাযথ মূল্যায়ন কাঠামো গড়া প্রয়োজন, যাতে বিভিন্ন সময়ে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য নিরসনে গৃহীত নীতিমালা এবং বরাদ্দকৃত সম্পদের বস্তুনিষ্ঠ পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন করা যায়। বাংলাদেশে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য নিরসনের জন্য একটি সমন্বিত প্রয়াসের বিকল্প নেই।

সেলিম জাহান
ভূতপূর্ব পরিচালক
মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং
দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

এই বিভাগের আরও খবর
abc
১৬ আগস্ট, ০৩:২৮ পি.এম
abc
১৬ আগস্ট, ০৩:২৪ পি.এম
abc
১৬ আগস্ট, ০৩:১২ পি.এম
abc
১৬ আগস্ট, ০৩:০৬ পি.এম
পাঠকের মন্তব্য
  • এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
মন্তব্য করুন
সর্বশেষ খবর
Make Your Business Digital
10%
OFF
Domain only
1650 TK
5GB NVME Hosting
2500 TK
High Speed Website with High Security
Call : 01631101031
SPACE FOR ADD
200 x 350
SPACE FOR ADD
200 x 350